
ডেস্ক:
বিএনপির মহাসচিব ও স্থানীয় সরকারমন্ত্রী মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরই বিএনপির রাষ্ট্রপতি পদে প্রার্থী হলেন। আজ দুপুরের পর জ্যেষ্ঠ নেতাদের সঙ্গে বৈঠক করে বিএনপির চেয়ারম্যান ও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান চূড়ান্ত করেছেন। আজই নির্বাচন কমিশনে রাষ্ট্রপতি পদে মির্জা ফখরুলের মনোনয়নপত্র জমা দেওয়া হবে।সংসদে বিএনপির নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা আছে। ফলে মির্জা ফখরুলই দেশের ২৩তম রাষ্ট্রপতি হতে যাচ্ছেন, এটা প্রায় পরিষ্কারই।আর তিনি রাষ্ট্রপতি হলে দল ও সরকারের তিনটি পদ ফাঁকা হয়ে যাবে।বিএনপি ও সরকারের সূত্র বলছে, রাষ্ট্রপতি পদে নির্বাচনের আগেই আজ দলের মহাসচিব ও জাতীয় স্থায়ী কমিটির সদস্যপদ ছেড়েছেন মির্জা ফখরুল। সরকারের স্থানীয় সরকারমন্ত্রীর পদও ছাড়বেন শিগগিরই। আর রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হলে সংসদ সচিবালয় মির্জা ফখরুলের ঠাকুরগাঁও-১ আসন শূন্য ঘোষণা করবে। এরপর ওই আসনে উপনির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে।মির্জা ফখরুল ইসলামের রাষ্ট্রপতি হওয়ার সম্ভাবনা যতই স্পষ্ট হচ্ছে, ততই সামনে আসছে বিএনপির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সাংগঠনিক পদ মহাসচিবের উত্তরসূরি কে হবেন—সে প্রশ্ন। প্রায় ১৬ বছর ধরে তিনি বিএনপির মহাসচিবের পদে রয়েছেন।মির্জা ফখরুল ২০১১ সালে বিএনপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব হন। এরপর ২০১৬ সালে দলের জাতীয় কাউন্সিলে আনুষ্ঠানিকভাবে মহাসচিব নিযুক্ত হন। দীর্ঘ এই সময়ে তিনি বিএনপির অন্যতম শীর্ষ নেতায় পরিণত হন। বিশেষ করে দলের দুই প্রধান নেতা খালেদা জিয়ার কারাবন্দিত্ব এবং তারেক রহমানের লন্ডনে নির্বাসনের পুরোটা সময় তিনি দলের গুরুত্বপূর্ণ নেতৃত্বে ছিলেন। এর মধ্যে আওয়ামী লীগ সরকারের সময় তিনি ছয়বার কারাগারে যান। বিগত সরকারের নানামুখী নির্যাতন ও প্রতিকূলতার মুখে তিনি দলের নেতৃত্ব দিয়েছেন। রাজনীতিতে তিনি একজন গ্রহণযোগ্য নেতা হিসেবে পরিচিতি লাভ করেন।এখন মির্জা ফখরুল রাষ্ট্রপতি হলে তাঁর সম্ভাব্য উত্তরসূরি কে—এ নিয়ে দলের ভেতরে কয়েক দিন ধরে দুজন নেতার নাম বেশি আলোচনায় এসেছে। তাঁদের একজন দলের স্থায়ী কমিটির সদস্য ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ। অন্যজন যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী।বিএনপির অভ্যন্তরীণ সূত্রগুলো বলছে, জাতীয় কাউন্সিলের আগে বা কাউন্সিলকে কেন্দ্র করে দলটি প্রাথমিকভাবে একজন ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব নিয়োগ করতে পারে। পরে জাতীয় কাউন্সিলে বা তার আশপাশের সময়ে এ বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়া হতে পারে।রুহুল কবির রিজভী নির্বাচন করেননি, তাঁকে মন্ত্রিসভায়ও রাখা হয়নি। তাই মহাসচিবের পদ শূন্য হলে রিজভীকে ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব করার সম্ভাবনা বেশি বলে মনে করছেন দায়িত্বশীল নেতাদের কেউ কেউ।সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, মির্জা ফখরুল পদত্যাগ করলে তাঁর মন্ত্রণালয়ে নতুন কাউকে দেওয়া হবে, নাকি বর্তমান মন্ত্রিসভা থেকে কাউকে দায়িত্ব দেওয়া হবে, সেটি এখনো পরিষ্কার নয়।আজ বিকেল চারটার মধ্যে রাষ্ট্রপতি পদের প্রার্থীদের মনোনয়নপত্র জমা দেওয়ার সময় নির্ধারিত আছে। এরপর যাচাই-বাছাই করা হবে। ১৮ আগস্ট মনোনয়নপত্র প্রত্যাহারের শেষ দিন। প্রত্যাহারের পর একাধিক প্রার্থী থাকলে রাষ্ট্রপতি পদের নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে ২০ আগস্ট, সংসদের সভাকক্ষে।ইতিমধ্যে বিএনপি রাষ্ট্রপতি পদে মনোনয়নপত্র সংগ্রহ করেছে। তবে কাকে রাষ্ট্রপতি পদে প্রার্থী করা হবে, সে ঘোষণা আনুষ্ঠানিকভাবে দেয়নি বিএনপি। দলটির সূত্র বলছে, মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের প্রার্থিতা নিশ্চিতই। এর মধ্যে রাষ্ট্রপতি পদে প্রার্থী হতে আপত্তি নেই—এমন অঙ্গীকারনামায় সই করেছেন মির্জা ফখরুল। এটি রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের আইনি প্রক্রিয়ার অংশ। আজ দুপুরে সচিবালয়ে বৈঠকের পরই রাষ্ট্রপতি পদে মির্জা ফখরুলের মনোনয়নপত্র জমা দেওয়া হতে পারে।অন্যদিকে জামায়াতে ইসলামীর নেতৃত্বাধীন ১১-দলীয় ঐক্যের পক্ষ থেকে লিবারেল ডেমোক্রেটিক পার্টির (এলডিপি) চেয়ারম্যান কর্নেল (অব.) অলি আহমদকে রাষ্ট্রপতি পদে প্রার্থী করা হয়েছে। এর ফলে দীর্ঘ প্রায় ৩৫ বছর পর রাষ্ট্রপতি পদে ভোট হতে যাচ্ছে।সংবিধান অনুসারে, রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হবেন সংসদ সদস্যদের ভোটে। বর্তমানে জাতীয় সংসদে বিএনপির দুই-তৃতীয়াংশের বেশি সংখ্যাগরিষ্ঠতা রয়েছে। অন্যদিকে জামায়াতসহ বিরোধীদের সদস্যসংখ্যা সংরক্ষিত নারীসহ ৯০। ফলে ভোটে বিএনপি–সমর্থিত প্রার্থীর জয় অনেকটাই নিশ্চিত। সে ক্ষেত্রে মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর দেশের ২৩তম রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হচ্ছেন, এটা অনেকটাই পরিষ্কার।গত ২৪ জুলাই রাষ্ট্রপতির পদ থেকে পদত্যাগ করেন ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানে ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগের (বর্তমান কার্যক্রম নিষিদ্ধ) মনোনয়নে নির্বাচিত মো. সাহাবুদ্দিন। স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব পালন করছেন। সংবিধান অনুসারে, রাষ্ট্রপতির পদ শূন্য হওয়ার ৯০ দিনের মধ্যে নতুন রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত করতে হবে।সংবিধানের ৫০ (১) ধারায় রাষ্ট্রপতির মেয়াদ উল্লেখ রয়েছে। এ ধারায় বলা হয়েছে, ‘রাষ্ট্রপতি কার্যভার গ্রহণের তারিখ হইতে পাঁচ বৎসরের মেয়াদে তাঁহার পদে অধিষ্ঠিত থাকবেন। তবে শর্ত থাকে যে রাষ্ট্রপতির পদের মেয়াদ শেষ হওয়া সত্ত্বেও তাঁর উত্তরাধিকারী-কার্যভার গ্রহণ না করা পর্যন্ত তিনি স্বীয় পদে বহাল থাকবেন। দুই মেয়াদের বেশি কেউ রাষ্ট্রপতি হতে পারবেন না। স্পিকারের কাছে স্বাক্ষরযুক্ত পদত্যাগ করে রাষ্ট্রপতি পদ ছাড়তে পারেন।’সংবিধানে আরও বলা আছে, রাষ্ট্রপতি তাঁর কার্যভারকালে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হওয়ার যোগ্য হবে না। অর্থাৎ রাষ্ট্রপতি পদে থেকে সংসদ সদস্য পদে থাকা যাবে না এ নির্বাচনে অংশ নেওয়া যাবে না। সংসদ সদস্য রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হলে রাষ্ট্রপতির কার্যভার গ্রহণের দিনেই সংসদে তাঁর আসন শূন্য হয়ে যাবে।তবে কোনো মন্ত্রী রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে জয়ী হলে শুধু নির্বাচিত হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে তাঁর মন্ত্রিত্ব শেষ হয়ে যায়—এমন সরাসরি বিধান নেই। কিন্তু রাষ্ট্রপতি হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণের সময় তাঁর আর মন্ত্রী হিসেবে বহাল থাকার সুযোগ নেই। কারণ, সংবিধানের ৫৬(১) অনুচ্ছেদে প্রধানমন্ত্রী, মন্ত্রী, প্রতিমন্ত্রী ও উপমন্ত্রীর পদকে সরকারের মন্ত্রিসভার কাঠামোর অংশ হিসেবে নির্ধারণ করা হয়েছে। অন্যদিকে ৪৮(২) বলছে, রাষ্ট্রপতি হলেন রাষ্ট্রের প্রধান।অতীতে আবদুর রহমান বিশ্বাস, আবদুল হামিদসহ অন্যান্য নেতা স্পিকার বা মন্ত্রিসভা থেকে রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হয়েছেন। তাঁরা তাঁদের পূর্বের পদ ত্যাগ করেছিলেন।
